Tuesday, November 5, 2013
বিডিআর হত্যা মামলার রায়ে বিজিবি প্রধানের সন্তোষ

বিডিআর হত্যা মামলার রায়ে বিজিবি প্রধানের সন্তোষ

পিলখানায় বিডিআর সদরদপ্তরে বিদ্রোহে হত্যাকাণ্ডের মামলায় দেয়া রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির (বিডিআরের পরিবর্তিত নাম) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমেদ।

রায়ের প্রতিক্রিয়া তিনি সাংবাদিকদের বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কলঙ্ক মোচন হয়েছে।

এছাড়া রায়ের পর্যবেক্ষণে দেয়া বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানান বিজিবি মহাপরিচালক।

এর আগে মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রাজজ মো. আখতারুজ্জামান আলোচিত এই মামলার রায় দেন।

রায়ে বিডিআরের তৎকালীন ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনকে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে আদালত।

বিএনপি নেতা নাসিরুদ্দিন পিন্টু ও আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়া ২৬২ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড দেয়া হয়েছে।

আর রাষ্ট্রপক্ষ অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারায় ২৭১ জনকে এই মামলা থেকে অব্যাহতি দেয় আদালত।

এর আগে সকালে রায়ের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে অভিযুক্তদের আদালতে হাজির করা হয়। আসামির সংখ্যা বেশি হওয়ায় আলিয়া মাদ্রাসা ও কেন্দ্রীয় কারাগার সংলগ্ন মাঠে ঢাকার জজ আদালতের এজলাস বসিয়ে এই বিচার চলে।

এদিকে, রায় ঘোষণাকে কেন্দ্র করে ওই এলাকায় বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশ এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সমন্বয়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়।

ইতোমধ্যে বিদ্রোহের বিচার শেষে বিভিন্ন মেয়াদে আসামিদের সাজা দিয়েছে বিডিআর আদালত। পিলখানায় হত্যা-লুণ্ঠনের বিচার হচ্ছে প্রচলিত আইনে। হত্যা মামলায় বিএনপি নেতা নাসিরউদ্দিন পিন্টুসহ আসামির সংখ্যা ৮৪৬ জন।

প্রসঙ্গত, বিডিআর (বর্তমান বিজিবি) জওয়ানদের ক্ষোভকে কেন্দ্র করে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার হন বিডিআরে কর্মরত ৫৭ চৌকস ও দক্ষ সেনা কর্মকর্তা। তাদের রক্ষা করতে গিয়ে প্রাণ হারান ৯ বিডিআর জওয়ানও।

এ ঘটনার পর বিডিআরের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।- বদলে ফেলা হয় এ বাহিনীর পোশাকও।

খালাসে উল্লাস, সাজায় ক্ষোভ-কান্না

খালাসে উল্লাস, সাজায় ক্ষোভ-কান্না

বাংলাকাগজ রিপোর্টঃ পিলখানা বিডিআর বিদ্রোহের রায়ের পর একদিকে যেমন দেখা গেছে কারো কারো খালাসের আনন্দ, অন্যদিকে দণ্ডিত হয়ে ক্ষোভের প্রকাশ। চার বছর আগে সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জনকে হত্যা মামলায় রায় ঘোষণা করা হয় মঙ্গলবার।
সকাল সাড়ে ৮টা থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে একে একে আনা হয় ৮১৩ জন আসামিকে। বিশাল এই বিচারকাজের এজলাস কক্ষও ছিল কিছুটা ভিন্ন ধরনের। সাধারণ অন্য বিচারে আসামিদের জন্য ছোট একটি কাঠগড়া থাকলেও এই এজলাস কক্ষের বড় অংশজুড়েই ছিল আসামিদের বসার জায়গা।
ওই কাঠগড়া আবার তিনভাগে বিভক্ত। পেছনের দিকে বড় অংশে আসামিদের এনে রাখা হয়। রায় ঘোষণা সময় বিচারক আসামিদের ‘সিএস (চার্জশিট) ক্রম’ উল্লেখ করছিলেন।
ক্রম অনুযায়ী আসামিরা এসে সামনের মধ্যবর্তী আরেকটি কক্ষে এসে বসতে থাকেন। বিচারক দণ্ড ঘোষণার পর সেখান থেকেই আসামিদের নিয়ে যাওয়া হয় কেন্দ্রীয় কারাগারে। এভাবেই সব দণ্ডের আসামিদের ক্রম ঘোষণা, আসন গ্রহণ, দণ্ড ঘোষণা এবং কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। আরেকটি কক্ষ ফাঁকা ছিলো।
সোয়া ১০ টার পর আসামি আনা শেষ হয়। ১২টার পর বিচারক আদালতে আসেন। ১২টা ৩৩ মিনিটে এজলাসে এসে রায় ঘোষণা শুরু করেন বিচারক। প্রথমে বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডিতদের সাজা ঘোষণা করা হয়। এরপর ঘোষণা করা হয় খালাসপ্রাপ্তদের দণ্ড।
এ মামলার ৮৪৬ জন জীবিত আসামির মধ্যে ১৫২ জনের ফাঁসি, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২৭৭ জনকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়। বাকি ২৫৬ জনকে তিন থেকে ১০ বছর পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদের কারাদণ্ড দেয় ঢাকার অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ।
খালাস ঘোষণার পর আসামিরা বিভিন্নভাবে উল্লাস প্রকাশ করতে থাকেন। এ সময় অনেকেই ‘মারহাবা মারহাবা’ বলে কোলাকুলি করতে থাকেন পরস্পরের সঙ্গে। আঙ্গুলে ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়ে তারা বিজয় প্রকাশ করেন। ডাণ্ডাবেড়ি ও হাতকড়া পরা আসামিদের কোলাকুলির সময় ‘ঝনঝন’ শব্দ হচ্ছিল। এ সময় প্রায় ১২ মিনিট বিচারক রায় ঘোষণা বন্ধ রাখেন।
এরপরই আসামিদের কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। নিয়ে যাওয়ার সময় আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশের প্রিজনভ্যান থেকে চিৎকার করে নাম জানিয়ে প্রতিক্রিয়া দেন খালাসপ্রাপ্তদের অনেকে।
রংপুরের বাসিন্দা সিপাহি জুবায়ের হোসেন ভ্যান থেকে চিৎকার করে বলেন, “সত্যের জয় হয়েছে, আমরা মুক্ত হতে পেরেছি। আদালত বলেছে আমরা নির্দোষ।”
দোয়া চাইলেন বরিশালের বাসিন্দা নুরুল আমিন। “আপনারা সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন।”
একই গাড়ি থেকে নায়েক সুবেদার ইদ্রিস আলী চিৎকার করে তার খালাসের কথা গণমাধ্যমকে জানান। ঢাকা মেট্রো-ম ০৫-০১৫৩ নম্বর প্রিজনভ্যানেই ছিল অন্তত জনাপঞ্চাশেক খালাসপ্রাপ্ত আসামি। 
পেছনের ভ্যানে হাবিলদার ওমর আলী ও সিপাহী তারিকুল টাঙ্গাইলে ভুয়াপুর এলাকার বাসিন্দা উল্লেখ করে তাদের খালাস পাওয়ার কথা জানান।
আসামিদেরকে নিয়ে যাওয়ার পর বিচারক আবার রায় ঘোষণা শুরু করেন। ক্রম উল্লেখ করার পর এবার সংশ্লিষ্ট আসামিরা মধ্যবর্তী একটি কক্ষে আসেন। এরপর তাদের যাবজ্জীবন দণ্ড ঘোষণা করেন।
এরপর নাসির উদ্দিন পিন্টু ও তোরাব আলী যাবজ্জীবন ও জরিমানার দণ্ড আলাদাভাবে ঘোষণা করা হয়।
রায়ের পর নিরব থাকেন তোরাব আলী। তবে পিন্টু বলেন, “সেই দিন স্কুল বন্ধ ছিল। সাক্ষী ছাড়া আমাকে দণ্ড দেয়া হয়েছে। নির্দোষ একটি মানুষকে এই দণ্ড দেয়া হল।”
পরে প্রিজনভ্যানে নিয়ে যাওয়ার সময় পিন্টু গণমাধ্যমকর্মীদের ক্যামেরা লক্ষ্য করে হাত নাড়েন। ১০-১৫ গজ দূরে পুলিশি ব্যারিকেডের বাইরে থাকা কোনো কোনো গণমাধ্যমকর্মী তাকে কিছু বলতে চিত্কার করে অনুরোধ করে। জবাবে হাত ইশারায় ‘না’ করে দেন তিনি। 
পরে আদালত আবার আসামিদের সিএস নম্বর উল্লেখ করতে থাকেন। যাবজ্জীবন দণ্ডের পরের দণ্ড হিসাবে ওই সিএস নম্বরধারীদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে বলে তখনই অনুমান করা যাচ্ছিল। তবে নম্বর উল্লেখের সময় এক আসামি চিত্কার করে কেঁদে উঠেন।
তিনি বলেন, “আমাকে ১ মিনিট সময় দেন। আমাকে এই সময়টা দিতেই হবে। এরপর আমাকে যা দণ্ড দিবেন আমি মেনে নেব।”
কাঁদতে কাঁদতে তিনি বারবার একই কথা বলতে থাকেন। তার চিত্কারের এক পর্যায়ে বিচারক তাকে থামানোর জন্য পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দেন। 
এ সময় পুলিশ সদস্যরা এগিয়ে গেলে রেজাউল আদালত কক্ষে থাকা বিজিবি মহাপরিচালককে উদ্দেশ্য করে বলেন, “ডিজি স্যার, ডিজি স্যার, আমাকে বাঁচান। আমি সেই রেজাউল না। সেই রেজাউল পলাতক। আমি নির্দোষ। আমাকে বাঁচান।”
এক পর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা তাকে থামালেও উচ্চস্বরে কাঁদছিলেন। পরে বিচারক নম্বর ঘোষণা শেষ করে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেন।
মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পর আসমিদের অনেকেই রেজাউলের মতো কান্নায় ভেঙে পড়েন। কাউকে কাউকে বলতে শোনা গেছে- “এই বিচারই শেষ বিচার না। একদিন আল্লাহর কাছে এটার আবার বিচার হবে। সাক্ষী প্রমাণ ছাড়া মৃত্যুদণ্ড দেয়ায় সেইদিন আপনার বিচার হবে।”
প্রিজনভ্যানে তোলার সময় আসামিদের অনেকে সেখানে থাকা গণমাধ্যমকর্মীদের লক্ষ্য করে গালাগালি করেন। তাদের বলতে শোনা যায়, “ওই ছবি তুলিস কেন? তোদের সাক্ষীর কারণেই আমাদের দণ্ড হয়েছে।”
এই মামলায় বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও সাক্ষ্য দিয়েছেন। 
‘পিলখানা হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক মোটিভ’

‘পিলখানা হত্যাকাণ্ডের রাজনৈতিক মোটিভ’

বাংলাকাগজ রিপোর্টঃ আলোচিত পিলখানা হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ১৫২ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মঙ্গলবার ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার মাঠে হত্যা মামলার বিচারে গঠিত বিশেষ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান ইতিহাসের সর্ব বৃহৎ এ রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার আগে তিনি এ মামলায় কিছু পর্যবেক্ষণ দেন। এতে প্রথমেই বিচারক রায় ঘোষণায় দেরি হওয়ায় দুঃখপ্রকাশ করেন। আখতারুজ্জামান বলেন, ‘ডাল-ভাত কর্মসূচিসহ এ ধরনের কোনো কর্মসূচিতে কোনো সুশৃঙ্খল বাহিনীকে যুক্ত করা উচিত নয়।’
পিলখানার হত্যাকাণ্ডের এটি একটি অন্যতম কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পিলখানা হত্যাকাণ্ডে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক মোটিভ থাকতে পারে। এছাড়া সামাজিক মোটিভও থাকতে পারে।’
এ সময় বিচারক বলেন, ‘পিলখানার ভেতর স্কুলগুলোতে বিডিআর জওয়ানদের সন্তানদের ভর্তি করতে পারার বিষয়ে ছাড় দেয়া প্রয়োজন। আবাসনের বিষয়টিও নজরে আনতে হবে। প্রয়োজনে পিলখানার ভেতরে বিডিআর জওয়ানদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে।’
উল্লেখ্য, ২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় বিডিআর সদর দপ্তরে এক বিদ্রোহে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। এ ঘটনায় বিচারের মুখোমুখি হন ৮৫০ জন। আসামির সংখ্যার দিক থেকে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় হত্যা মামলা।
এ ঘটনায় ২০০৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানার তত্কালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নবোজ্যোতি খীসা একটি হত্যা মামলা করেন। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ সুপার আবদুল কাহার আকন্দ মামলাটি তদন্ত করেন।

Copyright © 2012 দ্বিতীয় আলো All Right Reserved
Designed by CBTblogger